একটু কল্পনা করুন তো-
ঘরে বসেই নিজের পণ্য, সেবা বা ব্যবসার প্রচারণা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে করা যায়। এমনকি কাঙ্খিত গ্রাহকদের কাছে খুবই কার্যকরী উপায়ে প্রচারণা চালিয়ে নিজের ব্যবসার প্রসার ঘটানো যায়। Ijariit সংস্থাটি এ সম্পর্কে লিখেছে।
না, এসব কোনো কল্পনা নয়; বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়গুলোকে বাস্তবে রূপদান করেছে। অপরদিকে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর সর্বাধিক সমৃদ্ধ ক্ষেত্র, ফেসবুক মার্কেটিং ব্যবসার প্রচারণায় যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। এতো সহজে, এতো নির্দিষ্ট ভাবে ও এতো কম খরচে প্রায় ১৫০–২৫০ কোটি মানুষের কমিউনিটিতে প্রচারনার সুযোগ অবিশ্বাস্যই বটে। ফেসবুক মার্কেটিং ছাড়া যেনো ব্যবসার প্রচার ও প্রচারণা কিছুটা অপূর্ণই থেকে যায়, বিশেষ করে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে।
তাহলে জেনে নেওয়া যাক ফেসবুক মার্কেটিং এর গুরুত্ব, বিভিন্ন দিক, কৌশল এবং সুবিধা।
ফেইসবুক মার্কেটিং কী?
খুব সহজ ভাবে বলা যায়, ফেসবুকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার প্রচার বা বিজ্ঞাপন দেওয়াই হলো ফেসবুক মার্কেটিং। যেমন ধরুন, ‘ক’ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবাকে বিশাল পরিসরে এবং তার টার্গেট মার্কেটে বিজ্ঞাপন আকারে তুলে ধরলো, তাহলে এটাই ফেসবুক মার্কেটিং।
ফেসবুক মার্কেটিং হতে পারে দুই ভাবে। একটি বিজনেস পেজ খুলে নিজ প্রচেষ্টায় ব্যবসার প্রচারণা চালালে তা অর্গানিক বা ফ্রি ফেসবুক মার্কেটিং। আপরদিকে টাকার বিনিময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন প্রদান করলে সেটাকে ফেসবুক পেইড মার্কেটিং বলা হয়।
ফেইসবুক মার্কেটিং নিয়ে কিছু ইনফরমেশন
২০০৬ সালে মাইস্পেস ছিলো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর এক বড়ো নাম। তবে ২০০৮ সালের মধ্যেই সর্বাধিক ব্যবহৃত সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয় ফেসবুক। আর বিগত দশকের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে, অন্যতম বড়ো একটি মার্কেটপ্লেসে পরিণত হয়েছে ফেসবুক। আসুন নিচের ইনফোগ্রাফি থেকে ফেসবুক মার্কেটিং সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক:
Source: Statusbrew, David Wehner (Facebook CFO), Case Study By Buffer, Study By Wordstream, Sproutsocial.
এছাড়াও, ৯৫.৮% সোশ্যাল মিডিয়া মার্কটারদের মতে, সবথেকে কার্যকর মার্কেট হলো ফেসবুক। অন্যদিকে ৯৪% সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটার ফেসবুক মার্কেটিং করেন।
বিজনেসের জন্য ফেইসবুক মার্কেটিং কেন প্রয়োজন?
যদি বলা হয় যে, বিজনেসের জন্য ফেসবুক মার্কেটিং অত্যাবশ্যক বা করতেই হবে, তবে খুব ভুল বলা হবে না। হোক সেটা অর্গানিক বা পেইড বিজনেসের জন্য।
ফেসবুক মার্কেটিং এর প্রয়োজনীয়তা:
- সমৃদ্ধ এক বিজ্ঞাপন সেগমেন্টের মাধ্যমে সহজেই টার্গেটেড অডিয়েন্সের পেতে।
- ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতাদের মাঝে মিথষ্ক্রিয়া বাড়তে।
- বিশেষ করে ছোট ব্যবসার বা নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রে অর্গানিক বা খুব কম খরচে প্রচার করতে।
- ব্র্যান্ড এওয়ারনেসও গড়ে তুলেতে।
- সর্বোপরি, বর্তমান সময়ে ব্যবসার প্রচারণা ও প্রসারের দৌড়ে টিকে থাকতে প্রয়োজন ফেসবুক মার্কেটিং।
ফেসবুক পেইড মার্কেটিং কী?
ফেসবুকের বর্তমান অ্যালগরিদম অর্গানিক রিচের মাত্রা একদম কমিয়ে দিয়েছে (২.৬%)। এমত অবস্থায়, ‘ক’ যদি টাকার বিনিময়ে বিশাল পরিসরে, বা তার কাঙ্খিত এলাকায় এবং কাঙ্খিত ব্যক্তিদের, বা যারা তারা পণ্য ও সেবায় আগ্রহী হবে, এমন ব্যক্তিদের নিকট নিজের পন্য ও সেবার বিজ্ঞাপন পাঠায় বা প্রমোট করে, তাহলে সেটাই হবে ফেসবুক পেইড মার্কেটিং।
এক্ষেত্রে ফেসবুক বিজ্ঞাপন সেগমেন্টের ব্যবহার করে, বিভিন্ন দিক (ডেমোগ্রাফিক্স, টার্গেটিং অপশনস ইত্যাদি) বিবেচনায় নিয়ে টার্গেট বা কাঙ্খিত অডিয়েন্স নির্ধারণ করা যায় খুবই কার্যকরী উপায়ে। এই বিশেষ ফিচারটি খুবই ফলপ্রসূ এবং বিশ্বের অন্য কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এমন ফিচার নেই। (টার্গেট অডিয়েন্সের বিষয়ে আমরা একটু পরেই জানবো।
ফেইসবুকের মাধ্যমে মার্কেটিংয়ের সুবিধা
ব্যবসার প্রচার ও প্রসারে অভূতপূর্ব সুবিধা দিয়ে দিন দিন নির্ভরযোগ্য একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে ফেসবুক মার্কেটিং। তাহলে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক এর সুবিধাগুলো:
- মাসিক হিসেবে ১৫০-২৫০ কোটি মানুষের বিশাল কমিউনিটিতে বিশাল পরিসরে প্রচারণা ও টার্গেট মার্কেট গড়া যায়।
- টার্গেটেড অডিয়েন্সের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনকে শতভাগ কার্যকর করা যায়। এই সুযোগ অন্য কোনো মাধ্যমে নেই।
- যেকোনো সময় বিজ্ঞাপনের স্টেটাস চেক, বিজ্ঞাপন বন্ধ, নতুন বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়।
- ক্রেতাদের সাথে নিজ প্রতিষ্ঠানের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।
- অন্যান্য মার্কেটিং মিডিয়ার সাথে সুসম্পর্কের সুযোগ।
- নতুন ব্যবসা এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে একক প্রচেষ্টায়, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রচার করা যায়।
- বিনামূল্যে বা খুব কম খরচে প্রচারণা।
- ব্র্যান্ড এওয়ারনেস বা বিজনেস প্রসারিত করার সুবিধা।
ফেসবুক মার্কেটিং কীভাবে করতে হবে?
প্রথম কথা, সবকিছুর শুরু হয় মূলত একটা বিজনেস পেজ থেকে। তাই একটা বিজনেস পেজ খুলে, সেটাকে আগে বিজনেসের জন্য উপযোগী করতে হবে। নিয়মিত আপডেট করলেই বা ভালো রিচ থাকলে হবে না, পেজের সেটিংস, প্রোফাইল, লোগো এবং কাভার ফটোর দিকে নজর রাখতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে সামনের পদক্ষেপ গুলোর জন্য।
পর্যাপ্ত রিসোর্স না থাকলে অর্গানিক ভাবে একটা ফ্যান বেইজ গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে বর্তমানে ফেসবুকের অ্যালগরিদমে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই এটাই সত্যি যে অর্গানিক পদ্ধতিতে খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই ভালো ফলাফল আশা করতে হলে, এখন ছোট বা বড়, যেকোনো ব্যবসার ফেসবুক পেইড মার্কেটিং করতে হবে।
পেইড মার্কেটিং আপনি নিজেও করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মার্কেটিং স্টার্টেজি সম্পর্কে দক্ষতা থাকতে হবে। অপরদিকে অতিরিক্ত ফি প্রদান করে ফেসবুক মার্কেটিং এক্সপার্টদের সাহায্য নিয়েও কাজটি করতে পারেন (এক্ষেত্রে আমরা আপনাকে সহযোগীতা করতে পারব)। বর্তমানে পেইড মার্কেটিং এর প্রভাব খুব বেশি, আর স্বাভাবিকভাবেই খুব কার্যকরী।
ফেসবুক মার্কেটিং করতে যা জানতে হবে
একটা বিজনেস পেজ খুলে ফেললেই আপনা-আপনি ব্যবসার কোনো পরিবর্তন আসবে না। ফেসবুক মার্কেটিং এ সফল হতে হলে থাকতে হবে বিভিন্ন বিষয়ে অনেক টেকনিক্যাল জ্ঞান। ফেসবুকে মার্কেটিং করতে যা যা জানতে হবে:
- পেজ তৈরি করা, পেজের সেটিংস অপটিমাইজ করা ও বিজনেসকে ফুটিয়ে তোলার কৌশল।
- ফেসবুক অ্যালগোরিদম নিয়ে ধারনা থাকা আবশ্যক।
- ফেসবুক ওপেন গ্রাফ বা কন্টেন্টের উপস্থাপনা।
- ফেসবুক পিক্সেলের ভূমিকা।
- বিজ্ঞাপন সেগমেন্টের টার্গেটিং ও ডেমোগ্রাফিক অপশনের ভূমিকা।
- সোশ্যাল মিডিয়ার “৮০-২০” নিয়ম বা এক তৃতীয়াংশ নিয়ম জেনে কন্টেন্ট মিক্সিং।
- এছাড়াও পেজের অ্যাক্টিভিটি রাখতে আরো অনেক বিষয়ে সম্পর্কে জানতে হবে। যেমন: পোস্টের টাইমিং, রিচ, বিশ্লেষণ ইত্যাদি।
টার্গেটেড অডিয়েন্স নিয়ে আলোচনা
যে সকল ফেসবুক ইউজারদের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছানো বা দেখানো হবে তারাই হলো টার্গেটেড অডিয়েন্স। কোন নির্দিষ্ট এলাকার বা নিদিষ্ট বৈশিষ্ট্যের (আয়, শিক্ষা, আগ্রহ, আচরণ ইত্যাদি) ইউজারদেরকে সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে ধরে নিয়ে টার্গেট মার্কেট গড়ে তোলা হয়। ফেসবুক বিজ্ঞাপন সেগমেন্টে রয়েছে অসংখ্য টার্গেটিং এবং ডেমোগ্রাফিক অপশন।
অন্যতম কিছু টার্গেটিং অপশন হলো:
- ডেমোগ্রাফিক: জনসংখ্যার সাথে সম্পৃক্ত সব ডেটাই (বয়স, লিঙ্গ, আয়, সহ অন্যান্য বিষয়) হলো ডেমোগ্রাফিক। সাধারণত একটি ব্যবসার পণ্য বা সেবায় কোনো বয়সের, লিঙ্গের, আয়ের বা রিলেশনশিপের মানুষ আগ্রহী হবে, এসব বিবেচনায় নিয়ে টার্গেটেড অডিয়েন্স গঠন করা হয়। যেমন: ‘ক’ এর বাচ্চাদের খেলনার ই-কমার্সের বিজনেসের মূল টার্গেট হবে বিবাহিত ইউজাররা।
- লোকেশন (এলাকা): দেশ, শহর, স্থানীয় এলাকা, এমনকি জিপ কোড ব্যবহার করেও টার্গেট করা সম্ভব।
- ইন্টারেস্ট (আগ্রহ): পণ্য বা সেবার ধরণ বুঝে নির্ধারণ করতে হয় যে কোন আগ্রহের মানুষ আপনার পণ্য বা সেবাতেও আগ্রহী হবে। যেমন: ‘ক’ এর যদি বই বিক্রয়ের ই-কমার্স বিজনেস থাকে, তাহলে যারা বিভিন্ন পাবলিকেশন ও লেখকের পেজ ফলো করেছে, তারা হবে ‘ক’ এর টার্গেটড অডিয়েন্স।
- বিহেভিয়ার (আচরন): ফেসবুক পিক্সেলের সাহায্যে বিশেষ আচরণের ইউজার ট্রাক করা হয়। যেমন: যারা সাম্প্রতি ‘ক’ এর ওয়েবসাইটে পণ্যের দাম চেক করেছে বা ব্লগে সাবস্ক্রাইব করেছে। এই টার্গেটিং খুব বেশি ফলপ্রসূ।
সঠিকভাবে টার্গেটড অডিয়েন্স নির্ধারণ করার উপর নির্ভর করে ফেসবুক মার্কেটিং এর সফলতা।
ফেসবুক মার্কেটিং টিপস এন্ড ট্রিক্স
ফেসবুক মার্কেটিং এর কিছু টিপস এন্ড ট্রিক্স, যা না জানলেই নয়-
- প্রথম দেখাতেই ভালো ইমপ্রেশন আসবে বা সবাইকে আর্কষণ করতে পারবে, পেজের এমন আউটলুক থাকতে হবে। পেজ সেটিংস অপটিমাইজ করা, হাই কোয়ালিটি ও সঠিক সাইজের হতে হবে প্রোফাইল ফটো (লোগো) ও কাভার ফটো সেট করতে হবে।
- ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পোস্ট, কমেন্ট, আপডেট দিয়ে সক্রিয় ফ্যানবেজ গড়ে তুলতে হবে।
- ব্যাপকভাবে অডিয়েন্স রিসার্চ করতে হবে; রিসার্চ না করে বিশাল পরিসরে টার্গেট করা ভু্ল। টার্গেটিং অপশন কাজে লাগিয়ে, টার্গেট মার্কেট তৈরি করা অত্যাবশ্যক।
- কোন সময় পোস্ট করলে পোস্টের রিচ, অডিয়েন্সের রেসপন্স ও অডিয়েন্সের কেমন হবে তা বিশ্লেষণ করে পোস্ট টাইমিং ঠিক করতে হবে।
- কন্টেন্ট মিক্সিং ও কন্টেন্ট ক্যালেন্ডার অত্যাবশ্যক। কারণ বিশ্বাস ও সম্পর্ক স্থাপনই আসল উদ্দেশ্য। কন্টেন্ট মিক্সিং এ সোশ্যাল মিডিয়ার “৮০-২০” (৮০% কন্টেন্ট শিক্ষা, বিনোদন ও তথ্যমূলক; ২০% বিজনেসের প্রচারণা) বা এক তৃতীয়াংশ নিয়ম (বিনোদন, সুসম্পর্ক এবং প্রচারণা-এমন তিনটি ভাগ ফলো করতে হবে।
- সবগুলো মেসেজ, রিভিউ ও কমেন্টের দ্রুত রেসপন্স দিয়ে মিথষ্ক্রিয়া বাড়াতে হব। পুল ও মতামত পর্বও প্রয়োজনীয়।
- ফেসবুকের অন্যান্য টুল ব্যবহার করতে হবে। যেমন: ফেসবুক গ্রুপ, বিজনেস ম্যানেজার, চ্যাটবট ইত্যাদি।
মোদ্দাকথা, সবাই ফেসবুক ব্যবহার করবে’-এমন সময় আসতে খুব বেশি দেরি নেই। এখনও প্রতিদিন ৫ লাখ নতুন ফেসবুক অ্যাকউন্ট তৈরি হয়। একই সাথে, প্রতিদিনই অসংখ্যা বিজনেস পেজ তৈরি করা হয়। এমনকি অনেক ব্র্যান্ড গড়ে উঠে ফেসবুক মার্কেটিং থেকে। আর ছোট বিজনেস হলো তো একমাত্র উপযোগী অপশন হলো ফেসবুক মার্কেটিং। কারণ এতো কম খরচ, এমন টার্গেটিং ও রিচের সুযোগ আর কোথাও নেই।
আশা করি আর্টিকেলটি পড়ে ব্যবসার প্রচারে ফেসবুক মার্কেটিং এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন।